বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৭ ১৪২৬   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

আজকের পটুয়াখালী
ব্রেকিং:
অনার্স ২য় বর্ষের ২৫ নভেম্বরের পরীক্ষা স্থগিত কোন অপপ্রচারে কান না দিতে জনগণের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান ‘গোলাপি’ যাত্রা রাঙ্গাতে কাল মাঠে নামছে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন সম্মানের দেশ: প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আজ সন্ধ্যায় আ. লীগের অভ্যর্থনা উপকমিটির সভা ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী শিখা অনির্বাণে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা দুদকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ সশস্ত্র বাহিনী নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন- প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আইভোরি কোস্টের রাষ্ট্রদূতের বিদায়ী সাক্ষাৎ সশস্ত্র বাহিনী জাতির গর্বের প্রতীক : রাষ্ট্রপতি আজ বিশ্ব টেলিভিশন দিবস সারাদেশের পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন লিখতে হবে স্পষ্ট অক্ষরে: হাইকোর্ট আজ সশস্ত্র বাহিনী দিবস শাহজালালে পৌঁছেছে পাকিস্তানের ৮২ টন পেঁয়াজ ক্রিকেটের সঙ্গে টেনিসও এগিয়ে যাচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালীতে বাস চলাচল শুরু রিফাত হত্যা : চার্জ গঠন ২৮ নভেম্বর
৫২

বাঘের দেশের সমুদ্র সৈকত

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০১৯  

সুন্দরবন ভ্রমণের বড় একটা অংশ কেটে যায় নদী-খালেই। যারা মনে করেন, সুন্দরবন মানেই সারাদিন বন-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো; তাদের ধারণা অনেকটাই ভুল। জলপথ দিয়ে যখন আপনার সুন্দরবন যাত্রা শুরু হবে, তখন থেকে বেশিরভাগ সময় কাটবে পানিতে। পুরো সুন্দরবন জুড়ে প্রায় দু’শটির বেশি খাল মাকড়সার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ছোট ছোট নৌকা দিয়ে যখন বনের ভেতরে প্রবেশ করবেন তখনই টের পাবেন সুন্দরবন কতটা সুন্দর! হিসেব করলে এটাও বেশ বড় ধরনের অ্যাডভেঞ্চার। তবে হ্যাঁ, মুখ বন্ধ রেখে মনের চোখগুলো খোলা রাখতে হবে। ‘এই বুঝি বাঘ এল’ এমনটাই মনে হবে তখন!

সুন্দরবনের চিকন চিকন খালগুলো এখনো আমার চোখের সামনে ভাসছে ঠিকই, কিন্তু সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে সেখানকার সৈকতগুলো। একেক সৈকতের একেক রূপ। বিশাল জলরাশির উচ্ছ্বাসতা ছাড়া একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো মিল নেই। কোনো সমুদ্র সৈকতে যেন মুক্তার দানা বিছিয়ে রেখেছে, আবার কোনোটার বালি এতটাই চাকচিক্য; তা কোন শব্দ ব্যবহার করলে বোঝানো যাবে তা আমার জানা নেই। এমনকি একটার তীরে কাশফুলের রাজ্য দেখেছি। তা দেখে দ্বিধায় পড়ে গেলাম, কাশবনে আগে যাব নাকি সৈকতে।

 

সুন্দরবনের চিত্রা হরিণ

সুন্দরবনের চিত্রা হরিণ

ট্যুর বুক-এর আয়োজনে আমরা অর্ধশত জন খুলনা থেকে সুন্দরবন যাত্রা শুরু করি ৩ অক্টোবর। বলতে গেলে চারদিনের প্রথম দু’দিন লঞ্চেই কেটেছে। খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা, গল্প-আড্ডা এসব করতে করতে সময় পার করেছি আমরা। লঞ্চ কিন্তু ছুটে চলছেই একটার পর আরেকটা নদীতে। দ্বিতীয় দিনে অবশ্য হাড়বাড়ীতে কেটেছিল কিছুটা সময়। মাঙ্কি ট্রেইলে হাঁটা, বানরের ছবি তোলা, পানীয় জলের পুকুরের মাঝখানের বিশ্রামাগারে কেউ কেউ ছবি তুলতেও গিয়েছিল... এইতো! তারপর আবার ছোট নৌকায় করে লঞ্চে উঠলাম। সেদিন বেশিরভাগেরই পুরো বিকেলটা কেটেছিল লম্বা ঘুমে! রাতে বার-বি-কিউ পার্টি ছিল, ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করেছিলাম সবাই মিলে। একে একে গান শোনালো সবাই। সুন্দরবনের ট্যুরিস্ট গাইড সুন্দর আলীর কণ্ঠে ‘সুন্দরবন’ শিরোনামের গানটিই সবচেয়ে বেশি হাততালি পেয়েছিল!

সুন্দরবনে কাটানো এই চারদিনে সবচেয়ে সুন্দর দিনটি ছিল তৃতীয় দিনটি। আগের রাতেই বলে দেয়া হয়েছিল, ভোর ছয়টার মধ্যে রওনা দেয়া হবে কটকা সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে। কিন্তু রাতভর আড্ডার কারণে সকালে বিশ মিনিট সময় মাশুল দিতে হলো। তাতে কারো আফসোস নেই। লঞ্চ থেকে ছোট নৌকায় দশ মিনিটেই আমরা পৌঁছে গেলাম কটকায়। সমুদ্র সৈকতের আগে বনটাই দেখা হয়েছিল আমাদের। পা রাখতেই দেখা মিলল অসংখ্য চিত্রল হরিণের। দুটা হরিণের বুকে বুকে মেলানো দেখে মনে পড়ে গেল ‘মাশরাফি-তাসকিনের’ সেই ছবিটার কথা! লাফ দিয়ে খেলার মাঠের দুই বাঘের বুকে মেলানোর ছবিটা আমার টেবিলে এখনো আছে। ক্যামেরাটা বের করে এবার হরিণেরটা তুললাম, সেটাও এখন ওই ছবির পাশে শোভা পাচ্ছে!

 

কটকার এমন দৃশ্য নজর কাড়ে যে কারো

কটকার এমন দৃশ্য নজর কাড়ে যে কারো

কটকার বন কার্যালয়ের পেছন দিক থেকে সোজা পশ্চিমমুখী কাঠের তৈরি ট্রেইলের শেষ মাথায় হাতের ডানেই টাইগার টিলা। এখানেই দেখতে পেলাম বাঘের পায়ের অসংখ্য ছাপ। গাইড জানালো, বাঘের আনাগোনার কারণেই জায়গাটির এমন নামকরণ। টাইগার টিলা থেকে সামান্য পশ্চিমে বয়ার খাল। দুইপাশে কেওড়া, গোলপাতা আর নানান পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে জায়গাটি। এছাড়া কটকার জেটির উত্তরে খালের চরজুড়ে থাকা কেওড়ার বনেও দেখা মেলে দলবদ্ধ চিত্রা হরিণ, বানর আর শূকরের।

সবশেষে গেলাম সমুদ্র সৈকতে। তখনই মাথার ওপর থেকে সোনালী রোদ কেটে গেল। অন্যদিকে পুরো সমুদ্র সৈকত জুড়ে যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সাদা সাদা ‘মুক্তার’ দানা। লাল কাঁকড়া আর কালো ঝিনুকেরও দেখা মিলেছে, তবে সাদাগুলো চোখে পড়ছিল বেশি। পানির ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাড়ে। যত এগুতে থাকবেন, দেখবেন একদিকে ছোট গাছের ঝোপঝাড়, অন্যদিকে ছোটবড় অনেক গাছ উপড়ে পড়ে আছে, কাঠগুলো নরম হয়ে গেছে, কিছু গাছ শুধু দাঁড়িয়ে আছে, পাতা নেই, কাণ্ড নেই, জীবন নেই। দেখেই বুঝতে পারবেন এসব সিডরেরই স্মৃতিচিহ্ন। একপাশে গাছে শেকড়, আরেকপাশে সমুদ্র মাঝখানে আমরা দাঁড়িয়ে ‘মুক্তার’ চাদরের মধ্যে। শুধু দু’জন আমাদের চেয়ে খানিকটা আলাদা ছিল। তারা একে অন্যের হাত ধরে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছিল বঙ্গোপসাগরের পানিতে। দেখতে কিন্তু ভালোই লাগছিল!

 

কটকা সৈকতজুড়ে যেন মুক্তার গালিচা

কটকা সৈকতজুড়ে যেন মুক্তার গালিচা

খুব কম সময়েই প্রকৃতি তার ভোল পাল্টালো, মাথার ওপর পড়তে থাকলো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমরাও ততক্ষণে নৌকায় চেপে বসলাম। পরের গন্তব্য জামতলা সৈকত। আগেই জেনেছিলাম নৌকা থেকে নেমে সৈকতে পৌঁছাতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ট্রেকিং করতে হয়। ছোট খাল দিয়ে ঢুকতেই প্রকৃতি আবারও ভোল পাল্টালো, তীব্র রোদ। কেউ গামছা, কেউ ছাতা মাথায় দিয়ে ট্রেকিং শুরু করলাম বনের ভেতর দিয়ে। সামনে পেছনে বন্দুকধারী গাইড। ‘ভাগ্যে থাকলে বাঘ দেখবেন’ গাইড সুন্দর আলী জানাল। আমরা বাঘ দেখার উদ্দেশ্যে নয়, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে মনের মধ্যে গেঁথে রাখার চেষ্টায় থাকলাম। আমার মনের মধ্যে এটাই ছিল ‘বাঘ দেখলেই বোনাস’!

পথে পথে একজন বললো, ‘এ সৈকত বুনো সুন্দরী’। আসলেই সত্য। প্রায় তিন কিলোমিটার ঘন সুন্দরী, গেওয়া, গরান, এবং কেওড়ার বন পেরিয়ে সৈকতে যেতে হয়ে। জামতলা সমুদ্র সৈকতের পথে শুধু ম্যানগ্রোভ বন নয়, ফার্নের ঝোঁপও পাড়ি দিতে হয় খানিকটা। পথে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও আছে। এই রাস্তাতেই হরিণ পালদের বিচরণ, শুকরের ছোটাছুটি ,বানরের কারসাজি, বাঘের হরিণ শিকার কিংবা রাজকীয় ভঙ্গিতে বাঘের চলাচল। এসব দৃশ্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে।

 

জামতলা সৈকত

জামতলা সৈকত

কিছুক্ষণ হাঁটার পর শুনতে পেলাম সমুদ্রের গর্জন! জামতলা সৈকত চোখে পড়তে দেরি, কিন্তু ব্যাগ রেখে নামতে দেরি নেই! একে একে নেমে পড়লো সবাই। এখানকার পানি খুব বেশি স্বচ্ছ নয়। তবে এই সৈকতের স্বকীয়তা হলো কালো বালির চাকচিক্য! দুপুরের সূর্য সরাসরি এই বালিতে পড়ে পুরো সৈকতকেই সৌন্দর্য দিয়েছে। কোথাও কোথাও দেখা যায় জোয়ারের ঢেউয়ে ধুয়ে যাওয়া সমুদ্র সৈকত।

সুন্দবনের শরণখোলা রেঞ্জের জনপ্রিয় একটি জায়গা হলো ডিমের চর। তৃতীয় দিনের শেষ ঘোরার জায়গা এটিই। দুপুরের খাবার খেয়েই ট্রলারে করে বিশ মিনিটে পৌঁছে গেলাম ডিমের চর। এই সৈকতটি নির্জন এবং পরিচ্ছন্ন। বেলাভূমি জুড়ে শুধুই দেখা যায় কাঁকড়াদের শিল্পকর্ম। অন্যপাশে বিশাল কাশবন। দেখে একজন তো বলেই ফেললো, উত্তরা দিয়াবাড়ির চেয়ে কাশবনটি আরো বড়। আমাদের কেউ সমুদ্রে দাঁড়িয়ে খোশগল্প করতে লাগলো, কেউ কেউ কাশফুলের মাঝে ডুব দিয়েছে। আমি দ্বিধায় পড়লাম, কোনটাতে যাব প্রথমে কাশবন না সৈকতে!

 

ডিমের চরে সূর্যাস্ত

ডিমের চরে সূর্যাস্ত

সন্ধ্যায় আমরা বিচিত্র এক আকাশ দেখলাম। সূর্য যেন সাত রঙের মতো ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। এমন রূপে সবাই মুগ্ধ। না হওয়ার উপায় কি, আমার জীবনে এরকম আকাশ প্রথমই দেখেছি; এতটাই অদ্ভুত। ধীরে ধীরে আকাশটা চাঁদের দখলে গেল। ওপাশের বন থেকে ভেসে আসতে থাকলো নানা পশু-পাখির আওয়াজ। অন্যদিকে লাখ কোটি জোনাকীর আলোর মেলা আর আকাশের অসংখ্য তারা। এসব দেখতে দেখতে মুগ্ধ ও বিমোহিত হলাম। কোনো কথা না বলে চুপচাপ হাঁটতে থাকলাম সমুদ্রের তীর ঘেঁষে। একটু দূরে সুন্দর আলী ভাই গান ধরেছেন, ‘ওরে সুন্দরবন, তুমি মায়েরই মতন...’।

এই বিভাগের আরো খবর